মানিব্যাগ । মেহেদী হাসান জয়
প্রতিদিনের মতো হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম। মাথা নিচু, মন ভার। হঠাৎই হোঁচট খেয়ে পড়লাম। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা মানিব্যাগ। চারদিকে তাকালাম কেউ নেই। ব্যস্ত রাস্তা, মানুষজন যাচ্ছে আসছে, কিন্তু এই ব্যাগটির দিকে যেন কারো খেয়াল নেই।
এক মুহূর্ত দ্বিধা করে ব্যাগটা তুলে নিলাম। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক রকম শব্দ হচ্ছে। যেন ভেতরটা কাঁপছে। রাস্তার পাশে গিয়ে ব্যাগটা পকেটে রেখে সোজা মেসে ফিরে এলাম।
রুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে ব্যাগটা খুললাম।
ভিতরে পনেরোটি এক হাজার টাকার নোট। সঙ্গে কিছু কাগজপত্র ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্র নাম মোহাম্মদ জামান । ঠিকানাও লেখা আছে, শহরের এক প্রান্তের পুরনো একটি এলাকায়।
হাত কাঁপছিল। চোখ টাকার দিকে, কিন্তু মন কেবল ভাবছে এখন কী করবো?
পরশু কোরবানির ঈদ। অথচ আমার হাতে এক টাকাও নেই। রমজানের শুরুতেই চাকরিটা চলে গেছে। মেসের বাকি ভাড়া, বাজারের দেনা, আর হাতে গোনা দুইটা টিউশনি ওগুলো দিয়েই কোনোভাবে বেঁচে আছি। বাড়িতে ঈদের সময় না গেলে যেন অপরাধ হয়, কিন্তু কিভাবে যাবো? কী নিয়ে যাবো?
মনে হচ্ছিলো, হয়তো আল্লাহ নিজেই এই ব্যাগটা আমার জন্য পাঠিয়েছেন! পনেরো হাজার টাকা এই মুহূর্তে সেটা আমার কাছে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় আশীর্বাদ।
এই টাকা দিয়ে অন্তত ঈদের দিন কিছু কিনে বাড়ি পাঠানো যাবে।
কিন্তু যতবার টাকার দিকে তাকাই, মনে হয় এটা আমার নয়। চোখ বন্ধ করলেই এক অচেনা মানুষের মুখ ভেসে ওঠে। ব্যাগের ভিতর সেই পরিচয়পত্রের ছবিটা বারবার মনে পড়ে।
রাত কাটলো না ঘুমিয়ে। যতবার চোখ বন্ধ করি, বুকের মধ্যে অস্বস্তি জমে। মনে হচ্ছিলো, কারো কোনো মূল্যবান কিছু আমি দখল করে বসে আছি। ভোর হতে না হতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম মানিব্যাগটা আমি ঠিকানায় গিয়ে পৌঁছে দেবো।
ঠিকানা অনুসরণ করে গেলাম সেই পুরনো এলাকায়। টিনের দোচালা একটি ঘর। বারান্দায় এক বৃদ্ধ শুয়ে ছিলেন নিঃশব্দে। দরজায় কড়া নাড়তেই ঘর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন, সঙ্গে দুইজন ছোট ছেলে।
আমি বললাম,
— এটা কি জামান সাহেবের বাড়ি?
মহিলার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই পাল্টে গেল। চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
— হ্যাঁ, আপনি কে?
আমি ব্যাগটা দেখিয়ে বললাম,
— এটা রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি। পরিচয়পত্র দেখে ঠিকানায় এলাম।
মহিলা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে বললেন,
— উনি তো তিন দিন আগে শহরে ঈদের বাজার করতে গিয়েছিলেন। এরপর আর কোনো খোঁজ নেই। ফোন বন্ধ। থানায় গিয়ে জিডি করেছি।
বাচ্চা দুটি নীরবভাবে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। তাদের চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন— “আমাদের বাবা কোথায়?”
মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম,
— আমি চেষ্টা করি শহরে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার।
সেইদিনই শহরে ফিরে থানায় গেলাম। কোনো তথ্য নেই। এরপর গেলাম নিকটস্থ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে এক কর্মী জানাল,
— তিন দিন আগে এক পথচারী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সঙ্গে কিছু কাগজ ছিলো না। অজ্ঞাতনামা হিসেবে মরদেহ মর্গে রাখা হয়েছে।
ভেতরে ঢুকে সাদা কাফনের নিচ থেকে মুখটা দেখলাম। বুকটা ধক করে উঠল। এই তো সেই মুখ! জামান সাহেব।
আমার গলা শুকিয়ে গেলো। যেন একটা দায়িত্ব ভর করলো আমার ওপর। ওনার পরিবারকে জানালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবার চলে এলো। কান্নার শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
তার স্ত্রী বলল,
— আমরা তো ভেবেছিলাম উনি হয়তো কারো কাছে আটকে গেছেন। এতদিন ধরে শুধু অপেক্ষা করেছিলাম!
সেদিন জানাজা হলো, দাফনও। আমি লাশ কাঁধে ধরেছি। সন্তানদের মাথায় হাত রেখেছি। মনে হচ্ছিল, এ যেন আমার স্বজনের মৃত্যু।
ঘরে ফিরে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। পকেটে হাত দিয়ে দেখি সামান্য কিছু টাকা বাকি আছে টিউশনির। ঈদের দুই দিন বাকি। বুঝে গেলাম এবার ঈদে আর বাড়ি যাওয়া হবে না।
সেই সামান্য টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম বিকাশে। মা ফোনে বললেন,
— কিরে, ঈদের আগে তুই এলি না কেন?
আমি বললাম,
— একটু কাজ আছে মা, ঈদের পর যাবো।
কোরবানির ঈদের সকালে শহরের এক কোণায় নিঃসঙ্গ রুমে বসে ছিলাম। পাশের বাসা থেকে ভেসে আসছিল গরুর ডাক, বাচ্চাদের আনন্দের চিৎকার, রান্নার ঘ্রাণ। সবাই ব্যস্ত, সবাই খুশি।
আর আমি?
একটা পুরনো বিছানায় বসে ভাবছিলাম, “আহা ঈদ…”
এই ঈদে কেউ গরু কোরবানি দেয়, কেউ ছাগল। আর আমি দিয়েছি নিজের লোভ, নিজের চাওয়া, নিজের ঈদের আনন্দ সব কিছু।
কিন্তু তারপরও মনে হলো, হয়তো এই প্রথম একটা ঈদে আমি সত্যিই “মানুষ” হয়ে উঠেছি।
