মেঘের পরে মেঘ জমেছে
মফস্বল শহরের উচু নিচু ভবনগুলোর মাঝে বড়ো বেমানান হয়ে দাড়িয়ে আছে বাড়িটা। পাকা দেয়ালের উপর লাল টালি লাগনো ছাদ। সামনে পেছনে টিনের বারান্দা। আশেপাশের সব বিল্ডিংগুলোর মাঝে বাড়িটা কিছুটা বেখাপ্পা লাগলেও তার বাসিন্দার এই নিয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। বাড়িটার সামনে একচিলতে আর পেছনে খানিকটা জায়গা আছে সাথে। ডেভলপারদের চোখ যে পড়েনি বাটিটার উপর তা নয়। কিন্তু কাজ হয়নি। ফায়জা নাহার এই বাড়ির মালিকের নাম। তিনি গোটা দুয়েক কাজের মানুষ নিয়ে একাই থাকেন। ছেলেমেয়েরা সবাই আমেরিকা কানাডা আর অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। তিনি নিজেও একসময় ঢাকা শহরে কাটিয়েছেন অনেকদিন। স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। স্বামীকে হারিয়েছেন বছর সাতেক। চাকরির মেয়াদ শেষ হবার পর ফিরে এসেছেন প্রথম জীবনের কাটানো নিজভূমে। চাইলে ঢাকাতেই থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সব ছেড়েছুড়ে বাকি জীবনটা এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।বছর তিনেক আগে এখানেই এসে থিতু হয়েছেন।
পেছনের জায়গাটুকুতে একটা করে আম আর ডাব ছাড়াও শাকসবজির বাগান আছে। এই দুর্মূল্যের বাজারে যা তাকে সাশ্রয় দিয়েছে। বাড়ি লাগোয়া পাক ঘর ছাড়াও তিনটা ঘরনিয়ে বাসাটা। বৈঠকখানা আর আর দুটো শোবার ঘর। বাড়িটা চালটা টালিখোলার হলেও আধুনিক জীবনের যা দরকার তার সবই আছে। গ্যাসের লাইন ইলেকট্রিসিটি। রানিং ট্যাপ ওয়াটার এটাচ বাথ সব ব্যবস্থাই আছে।
বিয়ের পর তার আর জামান সাহেবের সংসার শুরু হয়েছিল এই বাড়িতেই। জামান সাহেব এখানকার একমাত্র সরকারি কলেজের লেকচারার ছিলেন। শহরের কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে এইবাড়িটায় ভাড়া থাকতেন। বিয়েরপর জেলা শহর থেকে বৌকে নিয়ে এসে বাড়ির চাবির গোছা কুড়ি বছর বয়সী বৌয়ের আচলে বেঁধে দিয়ে বলেছিলেন এখন থেকে এই বাড়ির সবকিছুই তোমার। তখন অবশ্য বাড়িটা টিনের ছিল। ছিল মাত্র দুটো ঘর। ঘরবাড়ি বেশির ভাগ তাদের মতো টিনেরই। বৃষ্টি নামলেই জলতরঙ্গ বাজতো যেন। প্রথম প্রথম মন টিকতো না তার। লহরের জন্য মন কাঁদতো তার। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলেন।
সকাল থেকেই বৃষ্টি নেমেছে। ফায়জা নাহার বেডরুমে নামাজ শেষ করে বের হয়ে দেখতে গেলেন রান্নাবাড়া কতোদূর। আজকে বারান্দায় উঠা লাকড়ির চুলায় রান্না হচ্ছে। বৃষ্টিবাদলায় মাঝে মধ্যে লাকড়ির চুলায় রান্না করা খাবার খাওয়ার ইচ্ছে হয়। তাই এই ব্যবস্থা।ডাল ভাত আগেই হয়ে গেছে এখন বড়োবড়ো সরপুটি ভাজা হচ্ছে। বিয়ের পর এভাবে লাকড়ির চুলাতেই রান্না করতেন বেশ কয়েক বছর। বৃষ্টির দিন ঘরের চালে পানি পড়ে শব্দ উঠতো। জামান সাহেব তাকে সোনার তরী থেকে আবৃত্তি করে শোনাতেন। টিনের চালে বৃষ্টির পড়ার শব্দে মানুষটা কবি হয়ে উঠতো। অথচ ইকোনমিকসের শিক্ষক ছিলেন। একসময় বাড়িতে গ্যাস আসলো। বাড়িওয়ালা ঘরের দেয়াল পাকা করালেন ফাউন্ডেশন ছাড়াই । আশে পাশেও পাকা ঘর বাড়ি হতে লাগলো একটা দুটো করে।
ছোট ছেলের জন্মের পর একসময় জামান সাহেব বন্ধুর পরামর্শে ঢাকায় একটা বেসরকারী ব্যাঙ্কে ঢুকে গেলেন শিক্ষকতা ছেড়ে। মেয়ের জন্ম হলো। বড়ো হয়ে তারা প্রথমে স্কুলে পরে কলেজে যাওয়া শুরু করলো। তখনস ফায়জা নাহারের হাতে বেশ সময়। ঠিক করলেন পড়াশোনায় ফিরে যাবেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে বিএড পরে এম এড করলেন। বিএড করে একটা স্কুলে ঢুকে গেলেন। শহরের যান্ত্রিক জীবনের মাঝে মফস্বলের কাটানো সময়গুলো মিস করতেন দুজনেই। জামান সাহেব সেই সময় ব্যাঙ্কের কাজে এখানে এসেছিলেন। কি মনে করে বাড়িটা দেখতে এসেছিলেন। এসে দেখলেন আশেপাশে একতলা দোতলা ঘড়বাড়ি তৈরি হলেও বাড়িটা আগের মতোই আছে। শুনলেন বাড়ির মালিক খরিদ্দার খুজছেন। বিক্রি করে ছেলের কাছে বিদেশে চলে যাবেন। ফিরে ফায়জা নাহারের সাথে আলাপ করেন। পরে দেশের বাড়ির তারপ্রাপ্য জমি বিক্রি করে দিয়ে আর দুইজনের জমা টাকা দিয়ে বাড়িটা কিনে নেন। একতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ির কাজ করাতে থাকেন আস্তে আস্তে। একলার ফাউন্ডেশন দেবার কারণ বাড়িটা তারা একতলাই রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দুইবেডরুম বসার ও খাবার ঘরসহ বাড়িটা তৈরি করা হয়। প্রায়ই ছুটিছাটায় এখানে চলে আসতেন তারা। ছেলে মেয়ে বড়ো হওয়ার পর আসা হতো না। বাড়িটা বিক্রি করে দেবার কথাও উঠেছিল। ফায়জা নাহার রাজি হননি। জামান সাহেবও প্রানে ধরে বেচতে পারেননি। ছেলে মেয়েরা বিদেশে সেটেট হয়েছে। ছুটিছাটায় প্রায়শই দুজনে চলে আসতেন । জামান সাহেব চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন। সময় পেলেই দুজনে চলে আসতেনএখানে। কাটিয়ে যেতেন কয়েকটা দিন ফিরে যেতেন প্রথম যৌবনের দিনগুলোতে। তারপর তো চলেই গেলেন। তারপর চাকরি ছাড়ার পর ফায়জা জামান চলে আসেন এখানে। তারপর এখানেই আছেন। বৃষ্টির দিন টিনের চালে বৃষ্টি পড়ায় ফিরে যান অতীতে। বৃষ্টির শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় জামান সাহেবের ভরাট গলা। কানে বাজতে থাকে।
মেঘের পরে মেঘ জমেছে আঁধার করে করে আসে! ফিরে যান তিনি অতীতে।

বাহ..কি সুন্দর লিখেন