মায়াবিনী
রাস্তার মোড়টা ঘুরতেই হেডলাইটের আলোয় নিলয় দেখতে পেল, একটা মেয়ে হাত নেড়ে ওর গাড়ি থামাতে বলছে। নিলয় হার্ড ব্রেক করে গাড়ি থামালো। রাত সাড়ে নয়টায় এরকম নির্জন একটি জায়গায় ২০/২১ বছরের একটি মেয়েকে একা দেখতে পেলে যে কেউ অবাক হবে। মেয়েটি এবার দৌঁড়ে গাড়ির খোলা জানালায় এসে নিলয়কে বলল, “আমার গাড়ির চাকা পাংকচার হয়ে গেছে। আপনি একটু আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন, প্লিজ?” নিলয় সামনেই একটা লাল রঙের গাড়ি দেখতে পেল।
তারপর মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগল অচেনা মেয়েটিকে। এত রূপসী মেয়েও আছে পৃথিবীতে! জোছনা আর গাড়ির মৃদু আলোতেও ঝলমল করছিল তার মুখ। তবুও নিলয়ের কাছে মনে হলো মেয়েটির সারা মুখ জুড়ে যেন বিষাদের ছোঁয়া লেগে আছে।
নিলয়ের পাশে বসলো মেয়েটি। অদ্ভুত সুন্দর একটা ঘ্রাণ এসে লাগলো ওর নাকে। মেয়েটি ইতস্তত ভাবে বলল,
— স্যরি, আপনাকে ডিস্টার্ব করার জন্য।
নিলয় হেসে বলল,
— ইটস ওকে। এত স্যরি-ট্যরি বলতে হবে না। আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে, আমার গাড়ি ঠিকঠাক আছে। তাই আপনি আমার গাড়িতে করে আপনার বাড়িতে যাচ্ছেন, সেজন্য স্যরি বলতে হবে কেন? এবার ঝটপট আপনার ঠিকানাটা বলে ফেলুন।
মেয়েটি বলল,
— আমি মায়া। আমার বাড়ি এই তো কাছেই। এই রাস্তা শেষে একটু ডানে গেলেই হবে।
নিলয় ও নিজের নাম বলল। মায়ার বাড়ি এত কাছে জেনে নিলয়ের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলো, মায়া নামের এই মেয়েটি যদি তার পাশে এভাবে অনন্তকাল ধরে বসে থাকত! এই পথ যদি কোনোদিন শেষ না হতো!
ছোট্ট ছিমছাম একটা বাড়ি দেখিয়ে মায়া বলল, ওই তো আমার বাড়ি।
নিলয় বাড়ির সামনে গাড়ি থামালো। মায়া গাড়ি থেকে নেমে নিলয়কে থ্যাঙ্কস জানিয়ে বলল,
— যদি এক কাপ চা খেয়ে যেতেন, তাহলে খুব খুশি হতাম।
মায়ার সঙ্গ পাবার এই সুবর্ণ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। নিলয় এই সুযোগ লুফে নিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— হ্যাঁ, চা খাওয়া যেতে পারে।
গাড়ি থেকে নেমে মায়ার সাথে যেতে যেতে নিলয় ভাবতে লাগল, এটাকেই হয়তো বলে ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’। সদ্য বিসিএস করা যেই নিলয়ের পেছনে সুন্দরী মেয়েদের লাইন লেগে আছে, সেই নিলয় কী না অচেনা অজানা একটা মেয়েকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়েছে!
মায়াদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে নিলয় মুগ্ধ হয়ে গেল। কী সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো গোছানো একটি ড্রয়িংরুম! এক কোনায় টেবিলের উপরে মায়ার অপূর্ব একটি ছবি বেশ বড় করে বাঁধানো।
মায়া হাসি মুখে বলল,
— নিলয়, আপনি বসুন, আমি আপনার জন্য চা নিয়ে আসছি।
নিলয় আধা ঘন্টা ধরে সোফায় বসে আছে। কিন্তু মায়ার দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
এবার উঠে দাঁড়ালো সে। বেশ জোরেই বলল,
— মায়া, কোথায় গেলেন আপনি? ভেতরে কেউ আছেন?
ভেতর থেকে এবার একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা আর ১৭/১৮ বছরের একটি ছেলে আসলো। নিলয়কে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো তারা। ছেলেটি বলল,
— আপনি কে? কিভাবে এলেন এখানে? দরজা তো লক করা ছিল।
এঁরা নিশ্চয়ই মায়ার পরিবার। নিলয় একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
— আমি মানে, আমার নাম নিলয়। মায়ার গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই তাকে পৌঁছে দিতে এসেছিলাম। মায়াই তো দরজা খুলে আমাকে ভেতরে নিয়ে এলো।
এবার ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা দু’জন এদিক ওদিক তাকিয়ে জোরে জোরে বলতে লাগলেন, মায়া এসেছে! মায়া, কোথায় গেলি তুই মা? বাবা-মায়ের সামনে একটিবারের জন্য আয়।
বলতে বলতে জোরে কেঁদে উঠলেন তারা।
ছেলেটি “আপু, আপুরে, কোথায় তুই? একবার সামনে আয় আপু।” বলতে বলতে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
মায়ার বাবা এবার কাঁদতে কাঁদতেই নিলয়ের কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন,
— বুঝলে বাবা, মায়া আমাদের একমাত্র মেয়ে। আজ ওর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বছর আগে এই দিনে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা যায় ও। তারপর থেকে প্রতিবছর এইদিনে তোমার মতোই অচেনা কারো সাথে বাড়িতে এসেছে মায়া। কিন্তু আমরা কেউ তাকে দেখতে পাইনি। এই যে, যেমন আজও দেখতে পেলাম না।
মায়ার বাবা, মা আর ছোটোভাই অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলো।
আর নিলয় জল ভরা চোখে, টেবিলে রাখা- মায়া নামের মায়াবিনী মেয়েটির ছবির দিকে কেবল নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকলো।
