খাটের নিচের আতঙ্ক

ঘড়ির কাঁটা যখন সন্ধে ছ’টায় এসে ঠেকলো, শহরের বাকি অ্যাপার্টমেন্টগুলোর মতো সপ্তকও নিজের জানালার কাঁচগুলো একে একে বন্ধ করে দিচ্ছিল। কিন্তু এই পুরনো দোতলা বাড়িটার নিয়ম একটু আলাদা। এখানে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে জানালার কাঁচ বা দরজার ছিটকিনি দিয়ে রোখা যায় না সেগুলোকে। এ বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে পূর্বপুরুষদের পুরনো আমলের ঘড়িগুলোর টিকটিক শব্দ ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠে।
দাদুর মুখে শোনা সেই সাবধানবাণীটা সপ্তকের মাথায় হাতুড়ির মতো বাজছিল— “সপ্তক, বাইরে যত অন্ধকার ঘন হবে, ওরা তত তোর ঘরের কোণগুলো মাপতে শুরু করবে। অন্ধকার নামলেই ওরা বেরোয়।”
প্রথমে শব্দটা শুরু হয় ছাদ থেকে। মনে হয় কেউ যেন নগ্ন পায়ে খটখট করে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তারপর রান্নাঘরের বেসিনের কল দিয়ে গড়িয়ে পড়া ফোঁটা ফোঁটা জলের শব্দের সাথে মিশে যায় অদ্ভুত এক ফিসফিসানি। সপ্তক বিছানায় কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। ঘরের সিলিং ফ্যানের সুইচটা অন করা সত্ত্বেও একটা বরফঠান্ডা স্রোত তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ জানালার কাঁচের ওপারে একটা ছায়া নড়ে উঠল। ঘরের হলুদ আলোটাকে গিলে খেয়ে ঘরটা ধীরে ধীরে জমাট বাঁকা অন্ধকারে ঢেকে গেল। ইনভার্টারের লাইনটাও এই মুহূর্তে কেঁপে নিভে গেল। চারপাশে নিখুঁত, শ্মশানের মতো নীরবতা। ঠিক তখনই খাটের ঠিক নিচ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল—খুব কাছে, একদম কানের গোড়ায়।
“তুই দরজা বন্ধ করিসনি কেন রে সপ্তক?”
কণ্ঠস্বরটা চেনা! হুবহু মৃত মায়ের গলায় কে যেন ফিসফিস করে উঠল। সপ্তকের গায়ের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল। সে ভালো করেই জানে, এ তার মা নয়। মা তো বহু বছর আগে এই ঘরেই মারা গেছে। এরা হলো সেই ছায়াগুলো, যারা রূপ বদলায়, যারা মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে অন্ধকার নামলেই শিকার খোঁজে।
সপ্তক সাহস সঞ্চয় করে বালিশের তলা থেকে টর্চটা খুঁজতে হাত বাড়াল। কিন্তু তার হাত দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে, এক ইঞ্চিও নড়ছে না। খাটের নিচ থেকে এবার হাত বাড়াল লম্বা, হাড়জিরজিরে একটা কালো ছায়া। বরফের মতো ঠান্ডা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে তার গোড়ালি খামচে ধরল।
বাইরে তখন ঘুটঘুটে রাত। আর এ ঘরের ভেতরে অন্ধকার তার চূড়ান্ত রূপ নিয়ে গ্রাস করে নিয়েছে সপ্তককে। কারণ এ নিয়ম চিরন্তন—অন্ধকার নামলেই ওরা বেরোয়, আর একবার যারা বাইরে বেরিয়ে আসে, তারা খালি হাতে ফেরে না।
