শরৎচন্দ্র: মানুষের গল্পে সমাজের ছবি

বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন একজন লেখক, যাঁর গল্পে শুধু মানুষের প্রেম-বিরহ নেই আছে একটি সময়ের সমাজের প্রতিচ্ছবি।
যে সময়ে নারীর জীবন ছিল নানা সামাজিক বিধি নিষেধে বন্দী, বিধবার জীবন ছিল কঠিন, পণ প্রথা ও বাল্যবিবাহ ছিল সমাজের বাস্তবতা, আর জাত-পাত ও সামাজিক মর্যাদা মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করত, শরৎচন্দ্র সেই সমাজের মানুষের কথাই লিখেছেন।
‘দেবদাস’ এর পার্বতী শুধু প্রেমিকা নয়; তাঁর জীবনের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে পরিবার ও সামাজিক মর্যাদার কাছে ব্যক্তি স্বাধীনতার পরাজয়।
‘দেনা-পাওনা’ তে পণ প্রথার নির্মমতা, ‘চরিত্রহীন’ এ নারীর চরিত্র নিয়ে সমাজের দ্বিমুখী বিচার, ‘শ্রীকান্ত’ এ রাজলক্ষ্মী ও অভয়ার মতো নারীর আত্মমর্যাদা এবং ‘পল্লীসমাজ’ এ গ্রামীণ সমাজের নানা দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে।
আর ‘পথের দাবী’তে ব্যক্তিজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন ঔপনিবেশিক শাসন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে।
শরৎচন্দ্র সমাজসংস্কারের বক্তৃতা দেননি; তিনি মানুষের গল্প বলেছেন। কিন্তু সেই গল্প পড়তে পড়তেই পাঠক সমাজের অন্যায়, কুসংস্কার ও বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে।
তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তিনি সমাজের অবহেলিত মানুষকেও মানুষ হিসেবেই দেখেছেন।
সময় বদলেছে, সমাজও অনেক বদলেছে। তবু শরৎচন্দ্র আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তাঁর গল্পের মানুষগুলো আমাদেরই মতো ভালোবাসে, ভুল করে, কষ্ট পায়, সমাজের সঙ্গে লড়ে।
শরৎচন্দ্র তাই শুধু একটি যুগের লেখক নন; তিনি মানুষের চিরকালীন গল্পের কথাশিল্পী।
