দেবতার বর

[শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর ‘দেবদাস’ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো ধারণ করে লেখা ।]
দেবের আজ বিয়ে।
একটি মাত্র ছেলে দেবদাস। তাই ছেলের বিয়েতে আয়োজনের কোনো কমতি রাখেননি প্রতিমা দেবী। বাড়িজুড়ে সকাল থেকেই উৎসবের আমেজ। উঠোনে আলো, রান্নাঘরে ব্যস্ততা, আত্মীয়স্বজনের ছোটাছুটি—সব মিলিয়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে মুখার্জি বাড়ি।
কিন্তু বরযাত্রার সময় ঘনিয়ে এলেও দেবের কোনো দেখা নেই।
প্রতিমা দেবী অস্থির হয়ে উঠলেন।
—কুমুদ, তোমার ছোট দেবরকে দেখেছ?
—না মা, ছোটদাকে তো কোথাও দেখলাম না।
প্রতিমা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—ছেলেটাকে তুমি আদর দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছ। আজ তার বিয়ের দিন, আজও যদি এমন ছন্নছাড়া হয়ে ঘুরে বেড়ায়!
নারায়ণ মুখার্জি এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। এবার বললেন,
—আচ্ছা, পার্বতীর বাড়ি যায়নি তো?
প্রতিমা একটু থেমে বললেন,
—হতে পারে। ওরা তো ছোটবেলার সাথী। পারু আজ বিয়েতে আসতে পারছে না, হয়তো তাকে দেখতে গেছে।
নারায়ণ আর কিছু বললেন না। শুধু মৃদু স্বরে বললেন,
—হুম, বেশ!
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে সুমিত্রা দরজা খুললেন।
দরজার সামনে দেবদাস।
—কাকিমা, পারু আছে?
সুমিত্রা কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,
—পুজোর ঘরে। যাও, দেখে এসো।
দেবদাস ধীরে ধীরে পুজোর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,
—দেবদা?
দেবদাস মৃদু হেসে বলল,
—কী করে বুঝলি?
—তোমার প্রতিটি পদধ্বনি আমার চেনা, দেবদা।
দেবদাস ভেতরে ঢুকল। পার্বতী তখন প্রদীপের সামনে বসে ছিল।
দেব তার পাশে গিয়ে বসল।
—আরে বাহ! জমিদারবাবুর ঘরনি দেখি আর সেই ছোট্ট পারু নেই, বড় হয়ে গেছে!
পার্বতী শূন্য দৃষ্টিতে দেবের দিকে তাকাল।
—জমিদারের ঘরনিও আর নেই, দেবদা।
দেবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
—আরে, তাতে কী হয়েছে? তুই তো আমাদের পারু। আমার পারু। জমিদারবাবু চলে গেছে, আমরা তো আছি।
পার্বতী মৃদু হেসে বলল,
—বিধবার জন্য এ সমাজে কেউ থাকে না, দেবদা।
—বিধবা! ও কথা কেন বলিস?
—এটাই তো সত্য, দেবদা। চরম সত্য।
দেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুই চাইলে আবার তোর কপাল সিঁদুরে লাল হবে, পারু।
—না দেবদা। তা আর হবে না।
—কেন হবে না?
পার্বতী প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
—বিধবাদের সাধ থাকতে নেই, দেবদা। এ সমাজে তা মানায় না।
দেবের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল।
—সমাজে তো আমিও মানাই না। পারু, তোর দেব আবার তোর কাছে ফিরে এসেছে। চল।
পার্বতী মাথা নাড়ল।
—না, দেবদা।
—সেদিন তোকে বলেছিলাম, বুড়োর ঘরে যাস না। আমাকে ছেড়ে যাস না। সেদিন যদি আমার কথা শুনতিস, আজ কি তোকে এই সাদা শাড়িতে দেখতে হতো?
—ওসব পুরোনো কথা থাক, দেবদা।
—কেন থাকবে? না হয় আমি দেরিতে তোকে বুঝেছিলাম। তুই তো জানিস, আমি বোকা। কিন্তু তুই কেন সেদিন আমার হাত ধরলি না?
পার্বতী কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—সমাজ আমাকে কলঙ্কিনী বলত, দেবদা।
দেব তৎক্ষণাৎ বলে উঠল,
—কিসের কলঙ্ক? তুই আমার পারু। তোর কোনো কলঙ্ক আমি হতে দিতাম?
পার্বতী চোখ নামিয়ে নিল।
—ওসব কথা ছাড়ো, দেবদা। আজ তোমার বিয়ে। বরযাত্রার সময় হয়ে এসেছে। কাকিমা অপেক্ষা করছেন। তুমি ফিরে যাও।
দেব তাকিয়ে রইল তার দিকে।
—আর তুই? তুই কি অপেক্ষায় নেই?
পার্বতীর ঠোঁটে এক টুকরো বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠল।
—বিধবার একটাই অপেক্ষা থাকে, দেবদা—সেটা মৃত্যুর।
দেব রাগে কেঁপে উঠল।
—মারব কিন্তু! অমন কথা মুখে আনলে মারব।
পার্বতী মৃদু হেসে বলল,
—হুম, মারবেই তো। আজ পর্যন্ত নিজের অধিকার ভেবেই তো শাসন করে এসেছ।
দেবের চোখ চলে গেল প্রদীপের দিকে।
—ভালোই যদি না বাসিস, আজও কেন এই প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিস?
পার্বতী প্রদীপের শিখার দিকে তাকিয়ে বলল,
—ও তো আমার দেবতার জন্য। যতদিন বাঁচব, ততদিন দেবের পূজা দিয়ে এই প্রদীপ জ্বালিয়ে যাব। কখনো তার আলো নিভতে দেব না।
দেব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—পারু, তুই এখনো আমার সেই ছোট্ট পারুই রয়ে গেলি।
পার্বতী এবার দেবের দিকে তাকাল।
—আমার একটা কথা রাখবে, দেবদা?
—তুই যা বলবি, আজ তাই শিরোধার্য হবে। বল, কী চাস?
পার্বতী ধীরে ধীরে বলল,
—তুমি চন্দ্রকে বিয়ে করে নাও।
দেব চমকে উঠল।
—চন্দ্র? মানে চন্দ্রমুখী?
—হ্যাঁ, দেবদা। সে তোমায় ভীষণ ভালোবাসে।
দেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করল,
—আর তুই?
পার্বতী প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
—বিধবাদের কাউকে ভালোবাসতে হয় না, দেবদা।
রাত প্রায় বারোটা।
মুখার্জি বাড়িতে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
সকাল থেকে বিয়ের ব্যস্ততায় মুখরিত বাড়িটি যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
দেবদাসের কোনো খোঁজ নেই। দুপুরে পার্বতীর বাড়িতে গিয়েছিল—তারপর কোথায় গেল, কেউ জানে না।
হঠাৎ উঠোনের টিমটিমে আলোয় একটি ছায়া দেখা গেল।
দ্বিজদাস প্রথমে ছায়াটিকে চিনতে পারল।
—দেবদা!
কাছে গিয়ে সে থমকে দাঁড়াল।
—দাদা… এ কী সর্বনাশ করেছিস?
তার চিৎকারে কুমুদ ছুটে এল।
—ও মা! ও বাবা! দেখো, দেবদা কী করে এসেছে! মা… মা!
চিৎকার শুনে প্রতিমা দেবী ও নারায়ণ মুখার্জিও ছুটে এলেন।
প্রতিমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন দেবদাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর দিকে।
—দেব, এ কাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস?
দেব শান্ত কণ্ঠে বলল,
—তোমাদের পুত্রবধূ, মা। চন্দ্রমুখীকে।
এক মুহূর্তের জন্য সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল।
তারপর প্রতিমা দেবীর মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি।
তিনি কুমুদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কুমুদ, বরণডালা নিয়ে এসো। সবাই উলু দাও, শঙ্খ বাজাও। ঘরে লক্ষ্মী এসেছে।
মধ্যরাত।
দেবের ঘরে এসে চন্দ্রমুখী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—দেব, তুমি তো আমায় কখনো চাওনি। তবে বিয়ে করলে কেন?
দেব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তারপর মৃদু স্বরে বলল,
—পারু তার দেবতার কাছে একটি বর চেয়েছে। তাই।
চন্দ্রমুখী আর কোনো প্রশ্ন করল না।
ঘরের এক কোণে তখনও একটি প্রদীপ জ্বলছিল।
হয়তো সেই আলোয় কোনো এক বিধবার প্রার্থনা পৌঁছে যাচ্ছিল তার দেবতার কাছে।
