আমাদের লাল ফ্রিজ

ও আ..ল্লা..হ..হ, “ঠান্ডা পানিতে এত্ত শান্তি..!”
কয়েকদিন ধরে জ্বর-কাশিতে ভুগছি
জ্বর সেরে গেলেও কাশি তো সারে না। ঠান্ডা পানি পছন্দ করা আমি, কাশির ভয়ে কতদিন ঠান্ডা পানি খাই না।
ওদিকে ফ্রিজ খুললেই ঠান্ডা পানির বোতল আমাকে ইশারায় ডাকে। বোতলগুলোর শিশির ভেজা গা দেখে ঠান্ডা পানি খেতে মনটা আকুলিবিকুলি করে।
আজ রান্নার সময় কাচামরিচের জন্য ফ্রিজ খুলেছি, ঠান্ডা পানির বোতল আবারও আমাকে ইশারা দিল। অন্যদিন এইসব ইশারা উপেক্ষা করতে পারলেও আজ করতে পারলাম না। বোতল খুলে ঢকঢক করে ঠান্ডা পানি খাচ্ছি আর চোরের মতো এদিকসেদিক দেখছি। ছেলেমেয়েরা দেখে ফেললে বলবে, “আমাদের নিষেধ করে আম্মু নিজেই লুকিয়ে ঠান্ডা পানি খাচ্ছে..!”
৮০/৯০ দশকের স্মৃতি লিখতে গেলেই, সবাই বাড়িতে আনা প্রথম টেলিভিশন স্মৃতি নিয়ে লিখে। আজ আমি আমাদের বাড়িতে প্রথম ফ্রিজ আনার স্মৃতি কথা লিখবো।
আমাদের টেলিভিশন আব্বা কিনেছিলেন। ফ্রিজ কেনার আগেই আব্বা মারা গেলেন। ছোটবোন তার এক বান্ধবীর বাসায় ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেয়ে, বাসায় এসে ভাইয়ার কাছে ফ্রিজের বায়না ধরে।
আমিও ঠান্ডা পানি পছন্দ করতাম কিন্তু ভাইয়াকে ফ্রিজ কেনার কথা বলতে লজ্জা লাগতো।
আমাদের ছোট বয়সে, হঠাৎ আব্বার মৃত্যু আমাদের পরিবারের জন্য খুব বড় একটা ধাক্কা ছিলো।
আব্বা মারা যাওয়ায়, অল্পবয়সী ভাইটা ব্যাবসা সামলে সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছিলো। তারপরও বোনের আবদার পূরণ করতে ছোট্ট একটা ফ্রিজ কিনে।
আমাদের বাসায় যেদিন প্রথম লালটুকটুকে ছোট্ট ফ্রিজটা আনা হলো, ঠান্ডা পছন্দ করা আমার কাছে সেদিনটা স্বপ্নের মতো মনে হলো। ফ্রিজ চালু করার কিছুক্ষণ পর ডিপে হাত দিয়ে চোখ ভিজে গেলো, “আহা, কি ঠান্ডা..!”
সেদিনকার সেই অনুভূতি লিখতে গিয়ে আজ আবারও চোখ ভিজে গেলো।
তখন রমজান মাস, আমাদের বাসা থেকে বড় ডিশে করে পাশের মসজিদে ইফতার পাঠানো হতো। সাথে ছোট্ট একটা সিলভারের বালতি দিয়ে লেবুর শরবত। ফ্রিজ আনার পর থেকে আম্মা শরবতের বালতিতে বরফ দিয়ে দিতেন। বলতেন, “রোজাদার ঠান্ডা শরবত খেয়ে তৃপ্তি পাবে।”
পাশের বস্তি থেকে পরিচিত কয়েকজন খালা ইফতারের আগে বরফ নিতে আসতেন। আম্মা তাদেরকেও বরফ দিতেন, বরফ নিতে আসা কাউকে কখনো ফিরাতেন না।
সেই ছোট্ট ফ্রিজের ছোট্ট ডিপে, আম্মা ছোট ছোট স্টিলের গ্লাসে করে সবার জন্য বরফ বসিয়ে রাখতেন।
ছোট্ট একটা ফ্রিজ, সেটা পেয়েই আমরা কত খুশি, আমাদের কত সন্তুষ্টি।
অথচ, এখন সবার ঘরে বড় বড় ফ্রিজ দিয়েও হয় না, সাথে একটা ডিপ ফ্রিজও লাগে। সময়ের সাথে সাথে যেনো সবকিছুর বরকত চলে গেছে। আমাদের সময়টাই ছিলো বরকতময়।
লাল রঙের ফ্রিজের উপর আমার এত দূর্বলতা ছিলো, আমার সংসারের প্রথম ফ্রিজটাও কেনা হয়েছিলো লালটুকটুকে দেখে। আজও আমার কাছে ফ্রিজ মানেই প্রান ভরে ঠান্ডা পানি খাওয়া।
অনেকের ফ্রিজ মাছ-মাংসে ঠাসা থাকে, আমার ফ্রিজ পানির বোতলে ঠাসা থাকে।
এখন লালটুকটুকে ফ্রিজ চোখে পড়ে না। যদিও কখনো চোখে পড়ে, ফিরে যাই আমার কৈশোরের লাল ফ্রিজের সময়টাতে। সেই সময়টায়, যেই সময় আমাদের কাছে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি ছিলো আল্লাহপাকের কাছ থেকে পাওয়া নেয়ামতের মতো। যার শুকরিয়া আজও করলাম, “ও আল্লা..হ..হ, ঠান্ডা পানিতে এত্ত শান্তি..!”
