শিশিরের ঘ্রাণ

নয়ন খুব চন্চলা কিশোরী মেয়ে। কিন্ত খুব ভাবুক। গাছ ফুল ফল পাখি এদের সাথে তার সখ্যতা।
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে সে মায়ের সাথে চলে যায় তার দাদা বাড়িতে। কি সুন্দর ছবির মতো পরিপাটি তার গ্রামখানি। নয়নের গ্রামের নাম রুপসা। সে একদিন বাবাকে জিজ্ঞাসা করলো বাবা এ গাঁয়ের নাম রুপসা হলো কেন? বাবা বললেন অনেক আগ থেকে লোকমুখে প্রচলিত হতে হতে এ গ্রামের নাম রুপসা হয়ে গেছে।
ডাকাতিয়া নদী, কোল ঘেঁষে এই গ্রামটি। নয়ন তার বাবা মা সহ নৌকায় উঠে বসল। ঘাট থেকে মাঝি নৌকা ছেড়ে গেলো । নদীর পানির শ্যাওলা গন্ধ বাতাসে শীতের সুঁইচের মতো ঠান্ডা নয়নের গায়ে এসে লাগতে লাগলো। মা নয়নকে বললো মা সোয়েটার টা ভালো করে গায়ে পরে নে মাথায় টুপি দে। নইলে ঠান্ডা বসে গেলে ঘরে বসে থাকতে হবে।
নয়ন নৌকার গুলইয়ে বসে শীতের সোহাগী রোদের আদর নিচ্ছিল। মাঝি ভাই গান ধরলো হায়রে আমার মন মাতানো দেশ। এক অন্যরকম অনুভূতিতে অবশ হয়ে আসতে লাগলো নয়নের মন। আসলে এই বয়সটা প্রজাপতির মতো যা দেখে কিশোরী মন তাতে রঙ চাপিয়ে স্বপ্নীল করে তুলতে পারে।
আশে পাশে আরো নৌকা বৈঠা আর নদীর পানির এক যুগলবন্দি শোর তুলে যাত্রী পারাপার করছে।
দেখতে দেখতে মধ্য দুপুর হয়ে গেলো। কখন জানি নয়ন ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলো। ঘাটে এলে বাবা নয়নকে ডেকে তুললেন ওঠো মা আমরা চলে এসেছি। নৌকা ছেড়ে নয়নের বাবা ঘাট থেকে রিকশা নিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করলেন।
দুপুরে নয়ন অবাক চোখে গ্রামের ছেলে মেয়েদের সাঁতার দেখতে লাগলো। তারা কি সুন্দর সাঁতরে পুকুরের এমাথা থেকে ওমাথা যাচ্ছে। পানিতে সাঁতারের শব্দ ঢোলের বোলের মতো লাগছিল নয়নের।
শীতের বিকেলগুলো খুব ছোট। একটু কনে দেখা আলো ছোঁয়ানো বিকেলগুলো ঝুপ করে সন্ধ্যাকে আলিঙ্গন করে কুয়াশা চাদরে ঢেকে যায়। নয়ন গরম কাপড় জড়িয়ে বাবার হাত ধরে গ্রামের বাজার ধরে হাটছিল আনমনে। বাবার হাতের মুঠোয় তার হাত স্নেহের উন্ষতার পরশ পাচ্ছিল। আশপাশের গ্রামের চেনাজেনা মুরব্বিরা মাঝে মাঝে হাঁক দিচ্ছে মাস্টার তোমার সাথে কে হাঁটছে? অনেকদিন পর গ্রামে আসাতে নয়নকে কেউ চিনছে না। মনে মনে নয়ন কষ্ট পেলো তাকে কেউ চিনছে না বলে। বাবা যখন পরিচয় করিয়ে দিল তখন মুরব্বিরা নয়নকে দেখে বলতে লাগলো মাষ্টার মেয়ে তো বড় হয়ে গিয়েছে। নয়নের কথাগুলো ভালো লাগছিল না। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ভোঁ দৌড় দিয়ে মায়ের কাছে চলে গেলো। মা চাচীদের সাথে বসে উনুনের তাপে গা পোহাচ্ছে শীত তাড়াতে। হাতে ধোঁয়া ওঠা চা। হারিকেনের আলো কাঠ কয়লার উনুনের লাল আগুনের আবীর মাকে দেবীর মতো লাগছিল।
আটটার মধ্যে সবাই রাতে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। নয়নের দুচোখে ঘুম নেই। জানালায় বাইরে ভয়ংন্কর জোছনা। দাড়িয়ে থাকা গাছগুলো বাতাসে দুলে উঠছে থেকে থেকে। পেঁচার ডাক রাতের নিস্তব্দতা ভাঙছে। নয়ন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে চোখ শক্ত করে শুয়ে আছে।
বন্ধ দরজা,অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে গাঢ় ঘুমের ভারী নিশ্বাসের শব্দ আসছে নয়নের কানে। রাতের নির্জনতায় শব্দগুলো নয়নের ভয়কে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। দিনের বেলায় পাশের বাড়ির খুকির মা বলেছিল অধিক রাতে নাকি নিশিরা বের হয়। এই কথাগুলো এখন নয়নের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
গ্রামে সকাল হয় একটু আগে ভাগে। ভোরের আজানের সাথেই সবাই উঠে যায়। চারপাশে মোরগ ডাকছে। গাছে গাছে পাখিদের মিষ্টি ডাক নয়নের মন ভরে গেলো।
খুব ভোরে নয়ন হাঁটতে বের হলো সমবয়সীদের সাথে করে। যাবার সময় মা চাচী ডেকে বললো তাড়াতাড়ি চলে আসিস। খেজুরের রসের পায়েস রান্না করছি। গরম গরম খাবি। নয়ন মাকে বললো মা শহরে তো আমরা খাই। কিন্ত গ্রামের এই অপরুপ শোভা তো শহরে নাই।
ভোরের আলোতে রাতভর জমা শিশিরের লক্ষ লক্ষ হীরেরা ঝিকমিক করছে পুরো সরষে ক্ষেতে।
নয়ন মুগ্ধতার সাথে দেখছে। উত্তরের হু হু শীতের হাওয়ারা নয়নের চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছিল।
শিশিরের পানিতে নয়নের পা দুটো ভিজে উঠলো। সরিষা ক্ষেতের মাঝে মেঠো পথ ধরে নয়ন দৌড়াতে লাগলো আপন মনে।
কার্তিকের হিমের রাতের তারা ভরা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে নয়ন মাকে বলে মা তারাগুলো ঠিক তোমার নাক ফুলের মতো। মা বলে পাগলি মেয়ে একটা কি যে বলিস।
রুপসার সকালগুলো নয়নের কাছে আসে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে। আর ভোরের শিশির মাড়ানোর জন্য তার মন উদগ্রীব হয়ে থাকে। একদিন সে দাদীর কাছ থেকে তার সুপারির খালি কৌটা চেয়ে নিয়ে আসে। ভোরের শিশিরগুলো সে ভরে নিয়ে যাবে শহরে । শহরে পায়ে মাড়ানো শিশির কোথায় পাবে?
এক ঝাঁক টিয়া পাখি উড়ে গেলো বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে। শীতের রোদে চারপাশ থেকে তীক্ত কটু গন্ধ ভাসছে।
অনেক স্মৃতি সাথে করে নয়ন ফিরে গেলো ইট কাঠের শহরে। শহরে ভোরের শিশির জমে ধুলোমাখা জানালার কাঁচে। নয়ন তার আঙুলে ছুঁয়ে দেখতে চায় শহরের কাঁচের জানালার শিশির। কিন্ত শিশিরের ছোঁয়া সে পায় না। হঠাত তার মনে হলো মায়ের শাড়ির ভাঁজে আছে তার শিশিরের কৌটাটা। দৌড়ে গিয়ে সে কৌটাটা বের করে আনলো বুক ভরে কার্তিকের শিশিরের ঘ্রাণ নিল। বাবা মা দুজনে দরজায় দাঁড়িয়ে হাসলেন আর বললেন পাগলি মেয়েটা বড় হলো না। মা বাবাকে থামিয়ে বললেন থাক ওকে একা থাকতে দাও। এইগুলোই ওর স্মৃতি হয়ে থাকবে। আর বড় হলে তখন এই দেখার অনুভব করার জিনিস একই থাকবে শুধু দেখার চোখ বদলে যাবে। বাবা মাকে বললেন সত্যিই আজ আমার এ ঘরময় রুপসা গ্রামের কর্তিকের সেই শিশিরের ঘ্রাণ পাচ্ছি আমার নয়ন মায়ের শিশির বন্দনায়।
